ঢাকা,২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

‘বাবুর বাড়ি বা জমিদার বাড়ি’ নামক একটি ঐতিহ্যবাহি জনপ্রিয় নিদর্শন

received_983514388794513.jpeg

 

সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামে ঐতিহ্যবাহি এই জমিদার বাড়ির অবস্থান।
প্রাচীন পুরাকীর্তির অন্যতম নিদর্শন এই ঐতিহ্যবাহি জমিদার বাড়ি । প্রায় সাড়ে ৫ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তিন শত বছরেরও বেশি পুরানো এ জমিদার বাড়িটি এ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। দুঃখের কথা হচ্ছে, অযত্ন, অবহেলা আর সংরক্ষণের অভাবে পাইলগাঁও’র এই জমিদার বাড়িটি এখন প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার ছিলেন ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। তিনি ছিলেন সিলেট বিভাগের কংগ্রেস সভাপতি এবং আসাম আইন পরিষদের সদস্য।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অচ্যূতচরণ চৌধুরী পাইলগাঁও জমিদার বংশের রসময় বা রাসমোহন চৌধুরী হতে প্রাপ্ত সূত্রে লিখেছেন যে; “পাইলগাঁওয়ে বহুপূর্বকালে পাল বংশীয় লোক বসবাস করত। এ গোষ্টিয় পদ্মলোচন নামক ব্যক্তির এক কন্যার নাম ছিল রোহিণী। কোন এক কারণে রাঢ দেশের মঙ্গলকোট হতে আগত গৌতম গোত্রীয় কানাইলাল ধর রোহিণীকে বিবাহ করত গৃহ-জামাতা হয়ে এখানেই বসবাস শুরুকরেন। কানাইলাল ধরের আট পুরুষ পরে বালক দাস নামের এক ব্যক্তির উদ্ভব হয়। এ বালক দাস থেকে এ বংশ বিস্তৃত হয়। বালক দাসের কয়েক পুরুষ পর উমানন্দ ধর ওরফে বিনোদ রায় দিল্লীর মোহাম্মদ শাহ বাদশা কর্তৃক চৌধুরী সনদ প্রাপ্তহন। বিনোদ রায়ের মাধব রাম ও শ্রীরাম নামে দুই পুত্রের জন্মহয়। তার মধ্যেমাধব রামজনহিতকর কর্মপালনে নিজ গ্রাম পাইলগাঁও এ এক বিরাট দীঘি খনন করে সুনাম অর্জন করেন। তার দেয়া উক্তদীঘি আজও ঐ অঞ্চলে মাধব রামের তালাব হিসেবে পরিচিতহচ্ছে। মাধব রামের দুই পুত্র মদনরাম ও মোহনরাম । উক্ত মোহনরামের ঘরে দুর্লভরাম, রামজীবন, হুলাসরাম ও যোগজীবন নামে চার পুত্রের জন্ম হয়। এই চার ভাই দশসনা বন্দোবস্তের সময় কিসমত আতুয়াজানের ১থেকে ৪ নং তালুকের যথাক্রমে বন্দোবস্তগ্রহন করে তালুকদার নাম ধারণ করে। এদের মধ্যে হুলাসরাম বানিয়াচং রাজ্যের দেওয়ানি কার্যালয়ে উচ্চ পদের কর্মচারীনিযুক্ত হন। হুলাসরাম চৌধুরী বানিয়াচং রাজ্যের রাজা দেওযান উমেদ রাজারঅনুগ্রহে আতুয়াজান পরগণায় কিছু ভূমি দান প্রাপ্তহন। হুলাসরামের প্রাপ্তভূমির কিছু কিছু চাষযোগ্যও কিছু ভূমি চাষ অযোগ্যছিল। পরবর্তিতে হুলাসরাম চাষ অযোগ্য ভূমিগুলোকে চাষযোগ্যকরে তুললে এগুলোই এক বিরাট জমিদারীতে পরিণত হয়ে উঠে। হুলাস রামের ভাতুষ্পুত্র বিজয় নারায়ণের একমাত্রপুত্র ব্রজনাথ চৌধুরী জমিদারি বর্ধিত করে এক প্রভাবশালী জমিদারে পরিণত হন। ব্রজনাথ চৌধুরীর দুই পুত্র রসময় ও সুখময় চৌধুরী। রসময় চৌধুরীর পুত্র ব্রজেন্দ্র নারায়ণই ছিলেন এ বংশের শেষ জমিদার।”

বৃহত্তর সিলেট বিভাগের হলদিপুর, পাইলগাঁও, জগন্নাথপুর এবং বানিয়াচং এলাকা নিয়ে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌঃ বিশাল জমিদারী ছিল। এই বাড়ি থেকেই তিনি জমিদারী পরিচালনা করতেন। মোট বাড়ির সংখ্যা এখানে তিনটি। প্রথমটি বৈঠকখানা, তারপরেই কাচারীঘর এবং একদম ভিতরে অন্দরমহল। অন্দরমহলের পাশেই একটি জেলখানা রয়েছে। পুকুর রয়েছে দু’টি। একটি বৈঠকখানার বড়বাড়িটির সামনেই। আরেকটি ভিতরে অন্দরমহলের পিছনদিকে। অন্দরমহলের পাশেই রয়েছে রান্না করার জন্যে সুবিশাল এক রান্নাঘর। বৈঠকখানার বড়বাড়িটির সামনে রয়েছে একটি মন্দির। অযত্ন আর অবহেলায় মন্দিরটি ঘন গাছপালায় ঢেকে গিয়েছে। এখানে এখন বড় বড় সাপ এবং অন্যান্য সরীসৃপের বসবাস। তবে পর্যটকরা অতি সতর্কতার সাথে পরিদর্শন করে আসছে।

লোকমুখে শোনা যায়, ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী’র একটি মাত্র মেয়ে ছিল যিনি অজানা রোগে ভুগে মারা যান। তারপর দেশ বিভাজনের সময় বাবু এই জমিদারী ছেড়ে দিয়ে একেবারের জন্যে ভারতে চলে যান। বর্তমানে সিলেটপ্রবাসী জনাব আজমল হোসেন এই বাড়ি এবং বাড়ি সংলগ্ন জমি-জমা সরকার থেকে লীজ নিয়েছেন। অন্দরমহলের বাড়িটিতে কয়েকমাস পূর্বে তিনটি পরিবার বাস করত যাদের নিজস্ব কোন বাড়িঘর নেই। বর্তমানে একটি পরিবার (অস্থায়ীভাবে) অবস্থান করছে।

পাইলগাঁও গ্রামে জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌঃ ‘’পাইলগাঁও ব্রজনাথ উচ্চবিদ্যালয়’’ নামে নিজ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। শোনা যায়, তাঁর স্ত্রী রাণীর নামে রাণীগঞ্জ বাজারের নামকরণ হয়েছে। বর্ষায় হাওড় অঞ্চলে চলাচলের জন্য তাঁর নিজস্ব পানশী নৌকা ছিল। আর শুকনার সময় তিনি ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতেন।

বর্তমানে প্রতিদিন দর্শনার্থীরা ভিড় জমা’ন এ বাড়িটিতে। আদিকালের নির্মাণ জমিদারবাড়িটি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের স্মৃতিস্তম্ভ।

প্রতিবেদক
জাকারিয়া অাহমেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top