ঢাকা,৫ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শুভ জন্মদিন ডাঃ জোবায়দা রহমান : নিজাম ইউ জায়গীরদার

20210618_163211.jpg


বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হলেও নিজ দেশে নিগৃহীত ডা. জোবায়দা রহমান মেধা, মনন ও কর্মদক্ষতায় বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েও নিজ দেশেই নিগৃহীত হলেন বিশ্বখ্যাত চিকিৎসক ও বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। হীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রিয় কর্মস্থল থেকে চাকুরিচ্যুত হলেন জিয়া পরিবারের এই পুত্রবধূ। ডা.জোবায়দা রহমান কেবল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ কিংবা নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান শহীদ রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যাই নন, এর বাইরেও তিনি আপন মহিমায় ভাস্বর, আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। ডা. জোবায়দা রহমান নিজ মেধা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে বিশ্বের ৫৫টি দেশের মধ্যে সেরা চিকিৎসকের স্বীকৃতি পেয়েছেন। শিক্ষা জীবনে ডা. জোবায়দা রহমান কখনো দ্বিতীয় হন নি, না দেশে না বিদেশে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইতিহাসে ডিস্টিংশনসহ সর্বোচ্চ মার্কস পেয়ে এমবিবিএস পাশ করেছিলেন তিনি। জোবায়দা ইমপেরিয়াল কলেজ অব লন্ডন থেকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে মাস্টার্স অব কার্ডিওলজি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। চার বছরের মাস্টার্স অব কার্ডিওলজিতে (এমএসসি ইন কার্ডিওলজি) ডিস্টিংশনসহ শতকরা ৮৩ ভাগ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছেন জোবায়দা। যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউই), কমনওয়েলথভুক্ত দেশ, নাইজেরিয়া, চীনসহ মোট ৫৫টি দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা এই কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন। এ কোর্সে প্রথম হয়েছিলেন ডা. জোবায়দা রহমান। তিনি ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছেন। দেশি- বিদেশী নানা লোভনীয় প্রস্তাব, স্কলারশিপ ও উজ্জ্বল ক্যারিয়ার এর হাতছানিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি মানব সেবাকেই মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৯৫ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে উন্নীত হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামান্য চাকরিই বেছে নেন তিনি। এখনো তার ধ্যান জ্ঞান আর স্বপ্ন কীভাবে দেশের চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন হয়। তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, ডা. জোবায়দা রহমান বাংলাদেশের চিকিৎসাশাস্ত্রে উন্নয়নের বিষয়ে উদগ্রিব। দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের একটি হৃদরোগ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা তার প্রবল। তারা আরও জানান, বিশালাকার একটি হাসপাতাল গড়ার স্বপ্ন দেখেন জোবায়দা রহমান। কিন্তু বিধিবাম সেই তিনিই ব্যক্তি জীবনে একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি হয়েও শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়ার অপরাধে হীন রাজনৈতিক নিগ্রহের শিকার হলেন। তার এই চাকরিচ্যুতির ঘটনায় হতবাক হয়েছেন দেশে বিদেশে তার অগনতি শুভাকাঙ্খিরা। সংসদে কোনো সরকারী কর্মকর্তার চাকুরিচ্যূতির খবর ঘোষণা করার মত অভিনব ও হাস্যকর ঘটনা ইতোপূর্বে না ঘটলেও এমন হয়েছে ডা.জোবায়দা রহমানের ক্ষেত্রে। ডা. জোবায়দা রহমানের পক্ষে আইনজীবীর প্রতিবাদ সামান্য ক্ষতি? ডা. জোবায়দা রহমানের বরখাস্ত ও প্রেক্ষাপট। ঐ সময়ের ঘটনায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ ও ‘দুই বিঘা জমি’ পদ্য দুটির কিছু পঙ্ক্তি মনে পড়ে যায়। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের কাছে ক্ষুদ্র ক্ষমতার মানুষের অপরিসীম ক্ষতিও সামান্য মনে হয়। ডা. জোবায়দা রহমান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ। তিনি মরহুম রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা। কিন্তু এসব কিছুর ওপর তার পরিচয় তিনি একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী ও মাতা, এর সাথে যুক্ত হয় তার মেডিকেল অফিসার হিসেবে ক্ষুদ্র চাকরিটি। এই অরাজনৈতিক মেধাবী নারীর ক্ষুদ্র চাকরিচ্যুতিতে ১৬ কোটি মানুষের সংসদ সদস্যরা কি হাস্যরস খুঁজে পেলেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, এই অতি সামান্য ও অনুভূতিপ্রবণ একান্তই ব্যক্তি পর্যায়ের একটি সংবাদ কেনই বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিলেন তার কারণ উদ্ঘাটন করতে বেগ পেতে হবে বুঝতে পারছি। কারণ পরিবারের অন্যান্য সদস্যও বহুক্ষেত্রেই জানতেই পারেন না যখন একই পরিবারে কেউ চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়। অন্তত ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা দেবার মত সংবাদ এটি নয়। ডা. জোবায়দা রহমান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এমডি (কার্ডিওলোজি) কোর্সের ৩য় পর্বে অধ্যয়নরত অবস্থায় মারাত্মকভাবে অসুস্থ স্বামীর উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয় কর্তৃক যথাযথ প্রক্রিয়ায় ছুটি (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর পার-৫/ছুটি-১৭/ শিক্ষা/২০০৮/১১২৮, তারিখঃ ০৩.১১.২০০৮) গ্রহণ করে যুক্তরাজ্যে গমন করেন। নির্ধারিত ছুটির মেয়াদ শেষ হবার পূর্বেই সরকারি নিয়ম মেনে তিনি পুনরায় ছুটির জন্য আবেদন করলে মন্ত্রণালয় পুনরায় তিন মাসের জন্য ছুটি মঞ্জুর করে। উল্লেখ্য, তিনি বিনা বেতনে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি ভোগ করছেন বিধায় বিদেশে থাকাকালীন সময়ে সরকারি কোষাগার হতে কোনো বেতন-ভাতা গ্রহণ করেননি। স্বামীর অসুস্থতা নিরাময় না হওয়ায় তার সেবা করার জন্য মানবিক দিক বিবেচনা করে পুনরায় বহিঃবাংলাদেশ ছুটি প্রদানের জন্য তিনি যথানিয়মে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি। এরপরেও কয়েক দফা একই কারণে ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করলেও মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি শুধুমাত্র মারাত্মকভাবে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য বহিঃবাংলাদেশ ছুটিতে ছিলেন। এক্ষেত্রে তার অন্য কোনো ইনটেনশন ছিল না। তিনি তার শিক্ষা ও চাকরি জীবনে বিভিন্ন সময় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। বহিঃবাংলাদেশ ছুটি ভোগ সংক্রান্তে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস্, পার্ট-১ এর পরিশিষ্ট-৮ এ নিম্নরূপ বিধান রয়েছে- (১) বহিঃবাংলাদেশ ছুটি ভোগের অনুমতিপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে চাকুরী হইতে অপসারণের যোগ্য কর্তৃপক্ষ যদি এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, ছুটি শেষে তাহাকে পুনঃ কর্মে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হইবে না, তাহা হলে এই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে বাংলাদেশ ত্যাগের পূর্বে জানাতে হবে। (অনু-২৫) (২) সংশ্লিষ্ট কর্মচারী স্থায়ীভাবে অথবা সাময়িকভাবে শারীরিক বা মানসিকভাবে অযোগ্য কিনা তাহা বহিঃবাংলাদেশ ছুটিতে যাওয়ার মুহূর্তে নির্ধারণ করা সম্ভব না হলে, তাহা পরে দূতাবাসের মাধ্যমে তাঁহাকে অবহিত করতে হবে। উক্ত কর্মচারীকে ছুটি হতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তাহা দূতাবাসের মাধ্যমে জানাতে হবে। তবে ছুটি শেষ হবার কমপক্ষে তিন মাস পূর্বে তাহা দূতাবাসকে জানাতে হবে। (অনু-২৬) নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯ এর বিধি-৫ অনুসারে ছুটি পাওনা না থাকা সত্ত্বেও একজন স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে ভবিষ্যতে সমন্বয়ের শর্তে ব্যক্তিগত বিশেষ কারণে বা মেডিকেল সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে অবসর প্রস্তুতি ছুটির ক্ষেত্র ব্যতীত প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি প্রদান করা যায়। কর্তৃপক্ষ মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটিও প্রদান করতে পারতেন। কিন্তু তার ক্ষেত্রে তাও বিবেচনা করা হয়নি। কোন সরকারি কর্মকর্তাকে চাকরি হতে বরখাস্ত করার পূর্বে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাকে প্রথমে কেন তাকে বরখাস্ত করা হবে না তা জানতে চেয়ে একটি নোটিশ প্রদান করতে হয়। তিনি নোটিশের জবাব প্রদান করলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয় এবং পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। যদি সে প্রথম নোটিশের জবাব নাও দেয় তবুও তাকে অব্যাহতি প্রদানের পূর্বে ২য় বার নোটিশ প্রদান করতে হয়। সরকারী কর্মকর্তা ২য় নোটিশের জবাব দিলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়। যদি তিনি ২য় নোটিশের জবাব না দেন তবে তাকে অব্যাহতি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। যদি উক্ত সরকারী কর্মকর্তা বিদেশে অবস্থান করেন তবে দুতাবাসের মাধ্যমে তাকে নোটিশ প্রদান করতে হয়। তার ক্ষেত্রে এর কোন বিধানই অনুসরণ করা হয়নি। তাকে চাকুরী হতে বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে কোন বিধানই যথাযথভাবে মানা হয়নি। তিনি বারবার সরকারী সকল নিয়ম মেনে ছুটির জন্য আবেদন করলেও মন্ত্রণালয় কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ছুটি মঞ্জুর না করা হলেও তা তাকে জানানো হয়নি। অথচ বিভিন্ন সময় পত্রিকায় নানরকম ভুল রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে তার সম্মানহানি করা হয়েছে। এসকল মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ জানানো হলেও তা আমলে নেয়া হয়নি। বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারী সার্ভিসের অনেক কর্মকর্তাই ৫ বছর বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি ভোগ করে বিদেশ হতে আবেদন করেই ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। এর অসংখ্য নজির পাওয়া যাবে। বিভিন্ন কারণে সরকার একজন কর্মকর্তার ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারেন। সম্ভবত মানবিক কারণই সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করা হয় ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। তিনি বারবারই অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার বিষয়টি বিবেচনা করে মানবিক কারণে ছুটির জন্য আবেদন করেছেন। মানবিক কারণে অনেক কিছু করা গেলেও তার ক্ষেত্রে কোন মানবিকতাই বিবেচনা করা হয়নি। সরকারী চাকুরী হতে কোন সরকারী কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হলে তা সংসদে কোন মন্ত্রী উপস্থাপন করেন না। শুধুমাত্র ডা. জুবায়দা রহমান-এর ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে। দেশ বিদেশে তাকে ও তার পরিবারকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে এ কাজ করা হয়েছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এ কাজ করা হয়েছে বলে মনে হয়। ডা. জুবায়দা সব সময় নিজেকে রাজনীতির বাইরে রেখে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেশের মানুষকে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছন। সরকারী দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তিনি অনেক সামাজিক দায়িত্বও পালন করেছেন। রাজনৈতিক পরিমন্ডলে তার কোন বিচরণ নেই। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সংসদে একজন সরকারী কর্মকর্তার বরখাস্তের বিষয়টি নিয়ে হাসা হাসির অবতারণা করা কতটা যৌক্তিক হয়েছে তা বিবেচনার দাবি রাখে। কোন সরকারী কর্মকর্তাকে তার চাকুরী হতে অব্যাহতি প্রদান করা হতেই পারে। কিন্তু তা নিয়ে কোন দেশের সংসদে আলোচনা করা একটি বিকৃত মানসিকতার পরিচয় বহন করে। ডা. জুবাইদার চাকুরী হতে অব্যাহতি প্রদানের বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করে এবং তা নিয়ে ঐ সময় সংসদে হাস্যরসের অবতারণা করে দেশের একজন নাগরিকের মানবাধিকার লংঘন করা হয়েছিল বলে আমরা মনে করি। একই সাথে সংসদে বিষয়টি আলোচনা করে দেশের একজন নারীর সম্মানের প্রতি চরম অবমাননা করা হয়েছিল কিনা তাও বিবেচনার দাবি রাখে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top