ঢাকা,২৪শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পর্যটন কেন্দ্র রাতারগুলের সেকাল-একাল ভ্রমণ গাইড লাইন ও সম্ভাবনার কথা : আনোয়ার হোসাইন

Polish_20220124_121529122.jpg

আনোয়ার হোসাইন : বাংলাদেশের অ্যামাজন খ্যাত পর্যটন কেন্দ্র সিলেটের রাতারগুল। দেশের একমাত্র মিঠা পানির জলাবন এবং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এক বিশাল এলাকা। পৃথিবীতে মিঠাপানির যে ২২টি মাত্র জলাবন আছে, “রাতারগুল জলাবন” তার মধ্যে একটি। জানা যায়,এই জলাবনের আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর। রাতারগুল কে সোয়াম্প ফরেস্ট হিসাবেও অভিহিত করা হয়েছে। এর ৫০৪ একর এলাকাকে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়াও ৩১ মে ২০১৫ তারিখে বাংলাদেশের বন অধিদপ্তর ২০৪.২৫ হেক্টর বনভুমিকে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসবে ঘোষণা করে। এই এলাকা কে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসাবেও উল্লেখ করা হয়।

রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রের উদ্যোক্তা, গোয়াইনঘাট উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান সাংবাদিক অানোয়ার হোসাইন বলেন, ২০১০ সালে রাতারগুল গ্রামবাসী কে সাথে নিয়ে অামরা কয়েকজন অনেক কষ্ট করে, মিটিং করে,লিফলেটিং করে,পর্যটন নৌকার উদ্বোধন করে, পর্যটক যাতায়াতে সুবিধা দেখিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাই। সাংবাদিক অনেকে তখন সহযোগীতা করেছেন। ফলে রাতারগুল জাতীয় পর্যায় থেকে অান্তর্জাতিক মহলে সাড়া জাগায়। এর অাগে রাতারগুল পর্যটন কেউ জানতই না। বহু কষ্টের অাজকের রাতারগুল কে এখন অনেক সম্ভাবনার কেন্দ্র ভুমিতে পরিনত করতে হবে।

নামকরণঃ
সিলেটের স্থানীয় ভাষায় মুর্তা বা পাটি গাছ “রাতা গাছ” নামে পরিচিত। সেই রাতা গাছের নামানুসারে এ বনের নাম হয়েছে রাতারগুল। অাবার কারো কারো মতে, পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম অনুসারে উক্ত জলাবনের নাম রাতারগুল হিসাবে পরিচিতি পায়।

অবস্থানঃ
চিরসবুজ এই বিশাল বনটি গোয়াইন নদীর পরবর্তী অংশ চেঙ্গের খাল নদীর তীরে অবস্থিত। গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর ইউনিয়নে এই বনের অবস্থান।

উদ্ভিদ বৈচিত্রঃ
নানা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এই মিঠাপানির জলাবনটিতে উদ্ভিদের
দু’টো স্তর পরিলক্ষিত হয়। উপরের স্তরটি মূলত বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে গঠিত। যেখানে নিচের স্তরটিতে ঘন পাটিপাতার (মুর্তা) আধিক্য বিদ্যমান । বনের উদ্ভিদের চাঁদোয়া সর্বোচ্চ ১৫ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত । এছাড়াও অরণ্যের ৮০ শতাংশ এলাকাই উদ্ভিদের আচ্ছাদনে আবৃত । বনের স্বাস্থ্য সন্তোষজনক । এখন পর্যন্ত এখানে সর্বমোট ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে ।
এই বন মূলত প্রাকৃতিক বন হলেও পরবর্তিতে বাংলাদেশ বন বিভাগ, বেত, কদম, হিজল, মুর্তাসহ নানা জাতের জলসহিষ্ণু গাছ লাগিয়েছে। এছাড়া জলমগ্ন এই বনে রয়েছে হিজল, করচ আর বরুণ গাছ আছে পিঠালি, অর্জুন, ছাতিম, গুটিজাম এবং বট গাছ।
এখানে সবচেয়ে বেশি জন্মায় করচ গাছ (বৈজ্ঞানিক নাম: Millettia pinnata)। এখানকার গাছপালা বছরে ৪ থেকে ৭ মাস পানির নিচে থাকে। বর্ষাকালে এই বন ২০–৩০ ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। বাকি সারা বছর, পানির উচ্চতা ১০ ফুটের মতো থাকে। বর্ষাকালে এই বনে অথৈ জল থাকে চার মাস। তারপর ছোট ছোট খালগুলো হয়ে যায় পায়ে-চলা পথ। আর তখন পানির আশ্রয় হয় বন বিভাগের খোঁড়া বিলগুলোতে।

জলবায়ুঃ
সিলেটের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত ক্রান্তীয় জলবায়ুর এই বনটিতে প্রতিবছর ভারী বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে । বনের সবচাইতে কাছে অবস্থিত সিলেট আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্যমতে এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৪১৬২ মিলিমিটার । জুলাই মাসটি সবচাইতে আর্দ্র যখন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১২৫০ মিলিমিটার, অন্যদিকে বৃষ্টিহীন সবচাইতে শুষ্ক মাসটি
হল ডিসেম্বর । মে এবংঅক্টোবরে গড় তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়ায় ৩২° সেলসিয়াসে, আবার জানুয়ারিতে এই তাপমাত্রা নেমে আসে ১২° সেলসিয়াসে । ডিসেম্বর মাসে এখানকার আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিমাণ প্রায় ৭৪ শতাংশ, যা জুলাই-আগস্টে ৯০ শতাংশেরও বেশি ।

প্রাণিবৈচিত্র‍ঃ
জলমগ্ন বলে এই বনে সাপের আবাস বেশি, আছে জোঁকও। শুকনো মৌসুমে বেজিও দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে বানর, গুঁইসাপ; পাখির মধ্যে আছে সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঢুপি, ঘুঘু, চিল এবং বাজপাখি। শীতকালে রাতারগুলে আসে বালিহাঁসসহ প্রচুর
পরিযায়ী পাখি, আসে বিশালাকায় শকুনও। মাছের মধ্যে আছে টেংরা, খলিসা, রিটা, পাবদা, মায়া, আইড়, কালবাউশ, রুই সহ বিভিন্ন জাতের মাছ।

দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যবস্থাঃ
সিলেট শহর থেকে এর দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। সিলেট ওসমানী অান্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ধোপাগুল পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকে রাতারগুলের অবস্থান। সেখানে প্রবেশ ঘাট গুলি দিয়ে ডিঙি নৌকা নিয়ে প্রবেশ করতে হয় জলার বন রাতারগুলে।

ডিঙ্গি নৌকাঃ
জলে নিম্নাংঙ্গ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বনের গাছগুলো দেখতে বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এখানে ভিড় করেন পর্যটকগণ। বনের ভিতর ভ্রমণ করতে দরকার হয় নৌকার! তবে সেগুলো হতে হয় ডিঙি নৌকা। ডিঙিতে চড়ে বনের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে দেখা যায় প্রকৃতির রূপসুধা। তবে বনে ভ্রমণ করতে অনুমতি নিতে হয় রাতারগুল বন বিট অফিস কর্তৃপক্ষ থেকে।

ওয়াচ টাওয়ারঃ
রাতারগুল ওয়াচ টাওয়ার থেকে জলাবনের দৃশ্য এক অনন্য উপভোগ্য চিত্র । দৃশ্যময় পরিবেশ পর্যটক কে মাতিয়ে তুলে।

প্রবেশ ফিঃ
প্রতি পর্যটক ৫৭/
প্রতি নৌকা প্রবেশ ফি ১২৫/-
বিদেশী পর্যটক ২৫০০/- রাখা হয়েছে।

জনকল্যাণ কর্মসূচীঃ
বনবিট অফিস সুত্র প্রকাশ যে, রাতারগুল থেকে রাজস্ব আদায়ের ৫০ভাগ টাকা সরকারী গেজেট অনুযায়ী স্থানীয় বন নির্ভরশীল হত দরিদ্র জনগণের কল্যাণে ও রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। সরেজমিনে গেলে, সিলেটের সারি রেঞ্জের বন কর্মকর্তা সাদ উদ্দিন চলতি বছরে গত ৪ মাসে রাতারগুল পর্যটন থেকে প্রবেশ ফি বাবদ ৪০লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন,বন কর্মকর্তাগণ ও স্থানীয় জনগণ সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের ৫০ ভাগ টাকা রাতারগুল বনে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে, নিরাপত্তা স্বার্থে, গাড়ি পার্কিং, ওয়াস রুম নির্মাণ, যাত্রী ছাউনি তৈরি, গেস্ট হাউস নির্মাণে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মন্ত্রনালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রকাশিত গ্যাজেট মূল্যে পর্যটকদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে এবং আদায়কৃত রাজস্ব যথানিয়মে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এখানে অনেক বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানান তিনি।

কমিটিঃ
১. বনবিট প্রশাসনঃ
রাতারগুল বনবিট কর্মকর্তা মোবাইল ঃ 01712112511 (অাব্দুল ওদুদ)
সিলেট সারি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবাইলঃ 01743310205 (সাদ উদ্দিন)
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোবাইলঃ 01999007000 (তৌফিকুল ইসলাম)

২. রাতারগুল জীববৈচিত্র সংরক্ষন ও ব্যবস্থাপনা কমিটি।

অাইন শৃংখলাঃ
ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট জোন, মোবাইল 01320158275

প্রবেশ ঘাটঃ
১. রাতারগুল ঘাট
২. চিরিঙ্গি ঘাট
৩. মটর ঘাট
প্রবেশ সময়ঃ সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।

রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী স্থানে অন্যান্য সুবিধা দানে গড়ে উঠেছে ঃ
১. সোহেল স্কয়ার এন্ড রেস্টুরেন্ট।
২. হলি ডে হোম
৩.রামনগর বাজার
৪. বাগবাড়ি বাজার
৫. সার্বক্ষণিক যান চলাচল ব্যবস্থা।

রাতারগুল বনবিট অফিস সুত্রে জানা যায়, পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার পর থেকে রাতারগুল বন্য অবরন্যে এ পর্যন্ত প্রায় লক্ষাধীক দেশী বিদেশি পর্যটক প্রবেশ করেছেন। প্রবেশ ফি বাবদ রাজস্ব জমা হয়েছে ৬৫ লক্ষ টাকা। পরিদর্শন মন্তব্য বহি হিসাব মতে রাতারগুল পরিদর্শনে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক জ্বালানী মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান অাহমদ এম.পি, বন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার এম.পি, বাংলাদেশস্থ অামেরিকান এ্যাম্বসেডর mr Earl Robert Miller সহ খ্যাতি সম্পন্ন অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ীগণ রাতারগুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে ছুটে যান সেখানে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও পর্যটক অাকর্ষনে সিলেটের পর্যটন কেন্দ্র রাতারগুলে এক বিশাল সম্ভাবনার হাতছাঁনি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অত্র পর্যটন স্পট কে কেন্দ্র করে সিলেটের ব্যবসা বাণিজ্য ও পরিবহন খাত অনন্য এক উচ্চতায় অবস্থান নিবে। এমনটাই মনে করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

অান্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা একে নিউজের ব্যবস্থাপনায় “রাতারগুল” নামে একটি পর্যটন গাইড প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে । একে নিউজের এক কর্মকর্তা খুব শীঘ্রই তা প্রকাশের কথা জানিয়েছেন । এই গাইড বুকলেট প্রকাশিত হলে রাতারগুল সম্পর্কে জানার বাতায়ন অারো একধাপ এগিয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা অনেকের….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top